সোমবার, জুন ১৭, ২০২৪

আমাদের কণ্ঠস্বর

প্রধান ম্যেনু

তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

‘আমি স্বাধীনতা দেখমু, আমি যুদ্ধ করুম’

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলের মুহূর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের ঠিক বিপরীতে সাভার ডেইরি ফার্ম গেটের পাশে ফুটওভার ব্রিজের ডানপাশে চোখে পড়ে লাল সিরামিক ইটের বাঁধানো একটি কবর, যেখানে নামফলকে বড় করে লেখা ‘টিটোর স্বাধীনতা’। অন্য দু-চারটে কবরের চেয়ে এই কবরটি একটু আলাদা, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা শব্দটি, জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ। এখানে শায়িত আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের এক মহানায়ক, শহীদ বীরযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটো। ‘টিটোর স্বাধীনতা’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় একটি সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে, যার কি না ছিল স্কুলে যাওয়ার দিন, ভরদুপুরে তেপান্তরে দৌড়ে ঘুড়ি ওড়ানোর দিন, মা-বাবার আদরে কাটানোর দিন, অথচ সমস্ত আদর ভুলে বয়সকে ছাপিয়ে বড়দের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শত্রুসেনার ওপর, রাইফেলের সামনে বুক পেতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।

টিটো ১৯৫৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের উত্তর শেওতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। একাত্তরে তিনি কেবল ১৫ বছরের কিশোর, দশম শ্রেণির ছাত্র। তার ভাইকে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে, জ্বালিয়ে দেয় গ্রাম। চোখের সামনে এত নিরীহ মানুষের লাশ আর আর্তচিৎকার তার ভেতর প্রতিশোধ-স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। তার দেখা হয় ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে। তিনি কিশোর টিটোকে ঢাকা উত্তরের দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন ‘মানিক গ্রুপ’ নামে খ্যাত গেরিলা দলের কাছে অর্পণ করেন।

স্বল্প সময়ের ভেতর কমান্ডার বাচ্চুর (নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু) সঙ্গে টিটোর চমৎকার হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়। টিটোর কেবল একটাই চাওয়া, সে যুদ্ধ করবে, তাকে যুদ্ধের ট্রেনিং দিতে হবে। বাচ্চু ভাবেন, মাত্র ১৫ বছরের কিশোরকে যুদ্ধে জড়ানো ঠিক হবে না। টিটোকে বোঝানোর জন্য বলেন, তুমি তো এত ছোট, কেমন করে যুদ্ধ করবে? টিটো সর্বশক্তি নিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘আমি ওদের সবাইরে মাইরা ফালামু, ওরা আমার ভাইরে মারছে। আমি ওদের আগুনে পুইড়া ছাই বানামু। ওরা আমার গ্রাম পুড়াইয়া ছাই বানাইছে। সব কয়টারে গুলি করে মাইরা প্রতিশোধ নিমু।’ বাচ্চু এতটুকু কিশোরের প্রতিশোধ-স্পৃহা দেখে জিজ্ঞেস করেন—টিটো, স্বাধীনতা বলতে কী বোঝ তুমি? টিটো বলে, ‘হ, জানি! সবাই কয় দেশ স্বাধীন হইলে সবাই নাকি সুখে থাকব। দ্যাশ থিক্যা অশান্তি দূর হইব। আমি স্বাধীনতা দেখমু। আমি যুদ্ধ করুম।’ টিটোর মন রক্ষার্থে কিছু অস্ত্র ব্যবহার শেখানো হলো, কিন্তু বয়সে ছোট থাকায় তাকে সরাসরি যুদ্ধের সুযোগ দেওয়া হলো না। কিন্তু তার মাঝে অদম্য ইচ্ছা, সে যুদ্ধ করবেই। তাকে বোঝানো হলো, যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করাটাও যুদ্ধ। তাকে সে দায়িত্বটা দেওয়া হলো। কয়েক দিনের মধ্যেই সে সবার প্রিয় টিটো হয়ে উঠল। নভেম্বরের শেষ দিকে ঢাকার সাভার-আরিচা সড়কের দুই পাশ দখলে আসে ঢাকা উত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাভার থানাও ঘেরাও করেন মুক্তিযোদ্ধারা। একই সময় একদল পাকিস্তানি হানাদার ঢাকার পথে ফিরছিল। তারা এসে সাভার থানার পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চু ওদের প্রতিরোধে নেমে পড়লেন।

১৪ ডিসেম্বরের ভোরে, বর্তমান আশুলিয়া থানার জিরাবো এলাকার ঘোষবাগে চারশ মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু রণকৌশল বলে দিয়ে মাত্র ৫০ জনকে জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় রেখে, বাকি অন্যদের চার ভাগে ভাগ করে দেন। এই ৫০ জনের দলে পড়ে টিটো, সে এটা মানতে পারে না। টিটো কান্নায় ভেঙে বাচ্চুকে বলতে থাকে, ‘যুদ্ধে আমারে নিয়া যান। আমিও যুদ্ধ করুম।’ বাচ্চু গভীর আবেগে টিটোকে আদর করে বলেন, এই যুদ্ধে আমরা অনেকে না ফিরতে পারি। তুমি থাকো। টিটো কেঁদে বলে, ‘আপনারা সব মইরা যাইবেন আর আমি বাঁইচা থাকমু ক্যান? আমিও মরুম।’ বাচ্চু টিটোকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘টিটো, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। তুমি না স্বাধীনতা দেখতে চাও?’

যুদ্ধ শুরু হলো। তুমুল লড়াই। কিন্তু ভারী মেশিনগানটিকে ধ্বংস করতে না পারলে এ যুদ্ধে হানাদারদের হারানো যাবে না। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু সহযোদ্ধা আরিফকে নির্দেশ করলেন, সে যেন দৌড়ে ২ নম্বর দলের যোদ্ধা নুরুকে বলে, যেভাবেই হোক ওই ভারী মেশিনগান ধ্বংস করার চেষ্টা করে। আরিফ লিডারের নির্দেশমতো না গিয়ে কিশোর টিটোকে নির্দেশ দিল। যার রক্তে প্রিয়জন হারানোর প্রতিশোধ-স্পৃহা ও যার চোখে এক শোষণমুক্ত স্বাধীনতার স্বপ্ন, সেই টিটোকে আর কে পায়? নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে কাভারে না রেখে লাফ দিয়ে ওঠে। কোনো আড়াল ছাড়া মুক্তিপাগল কিশোর টিটো সোজা নুরুকে লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগল আর চিৎকার করে নুরুকে বলছিল লিডারের নির্দেশ। ঠিক তখনই সেই হেভি মেশিনগানের একঝাঁক বুলেট এসে বিদ্ধ করে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কিশোর টিটোর বুকে। বুলেটের আঘাতে মাটি থেকে কয়েক হাত ওপরে উঠে মাটিতে পড়ে যায় টিটোর দেহ। মেশিনগানের বুলেট ঝাঁজরা করেছে টিটোর বুক। টিটো চিৎকার করে বাচ্চু ভাইকে ডাকে, ‘বাচ্চু ভাই, আমারে বাঁচান।’

মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ে টিটোর দেহ। মুমূর্ষু টিটোকে দ্রুত পার্শ্ববর্তী ডেইরি ফার্মে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সেখানে ক্ষতবিক্ষত টিটুর দেহ থেকে রক্ত বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সাভারের লাল মাটিকে আরো লাল করে অসীম সাহসী প্রাণ টিটুর হৃদয়স্পন্দন ধীরে ধীরে সেখানে থেমে যায়। ততক্ষণে সাভার হয় শত্রুমুক্ত। তার পর সাভার ডেইরি ফার্ম গেটের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধারঘেঁষে সমাধিস্থ করা হয় টিটোর প্রাণহীন দেহকে। তার শেষ বিশ্রামের স্থানটি রক্ষার জন্য সাভার সেনানিবাস ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ‘টিটোর সমাধিস্থল’ নির্মাণ করে। সেই শান্তিপূর্ণ কবরের ওপর দুটি ফুলগাছ—একটি বকুল, অন্যটি কামিনী। ভিন্ন সৌরভের এ দুটি ফুলগাছ টিটোর কবরটি ছায়া দিয়ে গভীর মমতায় আগলে রেখেছে মায়ের আঁচলের মতোই। কিশোর টিটোর না দেখা স্বাধীনতাই আজ আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার এই মহান বীরকে চিরকাল মনে রাখবে বাংলাদেশ।

কৃতজ্ঞতা

১. নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, ঘুম নেই, অন্যনা প্রকাশনী

২. ফেসবুক গ্রুপ ‘গেরিলা ১৯৭১’

এই সংক্রান্ত আরো সংবাদ

কল-কারখানায় কোনো শিশুশ্রম নেই: প্রতিমন্ত্রী

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, প্রতিষ্ঠানিকবিস্তারিত পড়ুন

বেনাপোলের কিশোরী জোনাকির মরদেহ যশোরে উদ্ধার

যশোর শহরের রেলগেট পশ্চিমপাড়া মডেল মসজিদের পাশে একটি পুকুর থেকেবিস্তারিত পড়ুন

শিশুর স্কুল থেকে শেখা বদভ্যাস থামাবেন যেভাবে

স্কুল থেকে শিশুরা জীবনের দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন নিয়মকানুনবিস্তারিত পড়ুন

  • শিশুকে ‘ডব্লিউ পজিশনে’ বসতে বারণ করুন
  • ছুটিতেও চলুক জ্ঞানচর্চা
  • রাতে জন্ম নেয়া শিশুরা কেন ব্যতিক্রম? জেনে নিন
  • রাতে জন্মানো শিশুরা যেমন হয়
  • ধুলায় বাড়ছে শিশুর কাশি; কী করবেন?
  • বিশেষ যত্নে বড় করুন প্রতিবন্ধী শিশুকে
  • আপনার যে ভুলে সন্তান ক্লাসে অমনোযোগী!
  • যেভাবে আপনার কন্যা শিশুটির ক্ষতি করছে এ যুগের খেলনা
  • শীতে শিশুর প্রস্তুতি
  • শিশুর নাকে পানি ঝরার সমস্যায় কী করবেন?
  • শীতে নবজাতকের যত্নে কী করবেন