মঙ্গলবার, মে ২১, ২০২৪

আমাদের কণ্ঠস্বর

প্রধান ম্যেনু

তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম

গরু খোঁজা (একটি গল্প)

মশিউর রহমানঃ বছির গরু খুঁজছে। তার মাথার উপর রোদের তাপ নেই। ঝড় বয়ে গেছে মাঝরাতের দিকে। এখন চারিদিকে শান্ত নির্জনতা; মৃদু বাতাসে উৎকট গন্ধ। ধানী জমি লোনায় সাদা হয়ে গেছে। বছির আকাশের দিকে তাকায়। মাথার উপর দিয়ে কয়েকটা শকুন দক্ষিণে রড়ে যাচ্ছে। বেলা দ্বিপ্রহরের মত হবে- সে আন্দাজ করে।

বছির ভোর রাতে ররয়ানা হয়েছে; এমন তরতাজা বলদ, ভুমিহীন গৃহস্তের একমাত্র ভরসা ; প্রথমে সে লেচকার চরে খোঁজ করে। আগে দু’ একবার বান ভাসা গরু যেখানে পারয়া গেছে। নাজিম জোতদারদের গরু-মহিষের বাথান সুদ্ধু একবার বানের পানিতে ভেসে গেছিলো; সে গরু লেচকার চরে এসে রঠে। কিন্তু সেখানে এখন মানুষ-গরু কিছুই নাই । খালি খাঁ খাঁ থই থই। ঝড়-তুফানের গরু ভেসে গেলে কিছুটা আশা থাকে ; গরুর পানিতে ভেসে থাকার ক্ষমতা বেশি। কিন্তু মানুষ ভেসে গেলে তার কোন আশা নাই। আবশ্য কেউ কেউ গরুমহিষের লেজ ধরে দৈবক্রমে বেঁচে যায়- এ আশায় বছির গরু খুঁজতে থাকে ; আসলে বছির খুঁজছে তার বাবা উজির আলীকে। যদি গরুটার লেজ ধরে উজির আলী বেঁচে যায়–এ আশায়। পরক্ষণে বছিরের কোলজের ভিতর শিষ ধরে হাহাকার করে বছির ডুকরে কেঁদে রঠে “ বাপজান , বাপজানগো, কি কামটা করলা তুমি গো! ”

উপকূলের আর দশটা মানুষের মতো বছিরর জানে, ঝড় তুফান আসলে আগে পোষা গরুমহিষের গলার দঁড়ি কেটে দিতে হয়। তারপর পোষা পশুগুলোকে বদর পিরের হারলা করে দিয়ে মানুষজন যথা সম্ভব উত্তরে সরে যায় ; ঘঁটিবাটি গেরস্থালী জিনিস যা পারে সাথে করে নিয়ে যায়। তারপরও তাদের অজানা একটা টান থাকে চালচুলোহীন সংসারের প্রতি। যেমন গরুটার টানে আকৃষ্ট হয়ে থেকে গেল উজির আলী। উজির আলী ভূমিহীন বর্গাচাষী। একটা মাত্র গরু তার সম্বল। সে গরু রুজিদার সন্তানের মতো। ঝড়ের তান্ডবের আগে সবাই যখন উত্তরে সরে যাচ্ছে , উজির আলীর স্ত্রী মরিয়ম, সন্তান বছির ও রুচিয়া ততক্ষণে উত্তরের কমিউনিটি সেন্টারে যারয়ার জন্য উজির আলীকে পীড়াপিড়ি করে। “লর তাড়াতাড়ি কর , দেখনা, দরিয়া তার মা-বাপের ছদগা চায় ; তাজা মানুষ না খাইলে রাক্কইস্সা দরিয়া শান্ত অইবো না” মরিয়ম বলে ।

“তোমরা যাও, আমি গরুটারে শ্যাষ বারের মত একবার দেখি আসি” বলেই উজির আলী ঘরের পেছনে লাগোয়া একচালা গোয়ালের দিকে এগিয়ে যায়। উজির আলী সোহাগ করে গরুটার নাম রেখেছে ধলা। ধলা তখন অবাক চোখে গৃহস্থদের চলে যাওয়া দেখছিল। উজির আলী ধলার পিঠি হাত রাখে; গরুটা তখন উজির আলীর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে। উজির আলী ফুঁপিয়ে রঠে বলে, “ ধলা, তোর দিলে কত ব্যাথা; তোর জবান নাই বইল্যা ভাবছস আমি বুঝি না ? খাইয়া না খাইয়া ত একলগেই ছিলাম। তোর দুঃখু আমি বুঝম না ?” ধলার প্রতি অসীম মমতায় উজির আলীর মত বদলায়। সে ধলাকে ছেড়ে যাবে না ; মরলে একসাথে মরবে।

বছির ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার পায়ের আঙ্গুলে জখম জমে হাটুর পুরোনো গেঁটো বাত চাড়া দিয়ে উঠে। ক্ষুধায় তার পেটের মধ্যে ডাক ছাড়ে। কাল রাত থেকে কিছু পেটে পড়ে নাই। তার মা মরিয়ম ও বোন রুচিয়ার কথা মনে পড়ে। সারারাত আশ্রয় সেন্টারের মধ্যে মানুষ আর গরু-ছাগল গাদাগালি করে ছিলো। তাদেরও পেটে কোন দান পানি পড়ে নাই; তার উপরে ভোর রাত থেকে একটানা হাটা। কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। আগেই তার আরো দক্ষিণ দিকে যাওয়া দরকার ছিলো। বছির উঠে দাঁড়ানের চেষ্টা করে ; তারপর পা টেনে টেনে দক্ষিণে কাটাখালীর দিকে হেঁটে যায়।

দুই উপজেলার সীমান্তের মাঝখানে খালটা গভীর করে কাঁটা। চর টেংরার কাছে এসে খালটা তীব্র একটা বাঁক নিয়েছে। ভোর সকালে পাশের উপজেলার ছেলামত মেম্বার লোক লস্কর নিয়ে আসে কাটাখালীর বাঁকে। সেখানে গোটা বিশেক বান ভাসা লাশের সাথে উজির আলীর লাশর এসে আঁটকা খায় । মরে গিয়ে উজির আলীর হাত-পা টান টান শক্ত হয়ে আছে। তখনর হাত দুটো একটা গরুটার লেজ শক্ত করে ধরা। গরুটা আর কেউ নয়, উজির আলীরই প্রিয় পোষ্য ধলা। জোয়ারের তোড়ে উজির আলী বাঁচার তাড়নায় ধলার লেজ চেপে ধরেছিলো , কিন্তু ঝড়ের তান্ডবে দুজনেরই প্রান বায়ু পুরিয়ে যায়। গরুর সাথে উজির আলীর ফুলে উঠে ভাসতে ভাসতে কাঁটাখালীর বাঁকে এসে আটকে থাকে। উজির আলী উস্ত ল্যংটা ; স্রাতের টানে তার পিরানের কাপড় ভেসে গেছে। অন্য বিশটা লাশের সাথে উজির আলীর শরীরের ছালার চট জড়িয়ে পাশের উপজেলার নিরাপদ ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। লাশগুলো নেয়ার সময় যে লাশের দু’একজন গার্জেন ছিলো না, তা নয়। তাদের ছেলামত মেম্বার আশ্বাস দিয়ে যায় ” চিন্তা করিও না,তোমাদের রিলিফ দেওয়া অইবো। রিলিফ পাইবা ঘরের টিন,গরু-ছাগল,মুর্দারা পাইবো গোর দেওনের কাফনের কাপড়। লাশগুলো নেওয়া হচ্ছে হাবিব উল্লা চেয়ারম্যানের নির্দেশে তার খামার বাড়ির উঠানে।” লাশের গার্জেনরা আর কোন বাধা দেওয়ার চেস্টা করে না। এক উপজেলার লাশ পাশের উপজেলায় নিয়ে গেলেও তাদের চেয়ারম্যান মেম্বারের কোন হদিস নাই। অতএব বাধা দেওয়ারও কোন কারন নাই।

জরিনা মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে হাউ-মাউ করে কান্দে, তার স্বামী কুদ্দুছকে ছেলামত মেম্বার নিয়ে গেছে। কুদ্দুছ তো নয়,কুদ্দুছের লাশ। জরিনা কান্দে,”আমার রিলিফের দরকার নাই,ভাইরে, তোরা আমার সোয়ামীরে আনি দে! সোয়ামী হারাইলাম,আর রিলিফ দি কি করুম,ভাইরে——” ততক্ষনে বছির কাটাখালির বাঁকে পৌঁছায়। জরিনার সে কান্দন থমকে থাকা মেঘের সাথে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। সে কান্নায় সংক্রমিত হয়ে ভেউ করে কেঁদে উঠে বছির। ডুকরে ওঠে জব্বর মাঝি। আহ্ হা হু হু করে কাদে কেউ কেউ। তাদের সে সমন্বিত কান্নার স্বর মনে হয় দশদিগন্তবিস্তৃত করে আসা আরেকটা ঘূর্ণিঝড়।

হাবিব উল্লা চেয়ারম্যান তৃপ্তির নিঃস্বাস ছাড়ে; কাজ ঠিকমত এগুচ্ছে। এর মধ্যে তিন বার সে ছেলামত মেম্বারের প্রশংসা করে। লাশগুলো তার উঠানে ঠিক ঠাক মত উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে লোকটার যোগ্যতা আছে বটে। চরের ব্যাপার, এরকম ঝড় তুফান হলে কতজন কত মতলব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তখন এক ধরণের ছিচুকে চোর বের হয়। এরা মানুষের ভিটে-মাটিতে ফেলে যাওয়া দা-খন্তি,ঘটি-পাতিল, কাঁথা-কম্বল চুরি করে। আবার কমিউনিটি সেল্টারের মধ্যে কেউ কেউ বদমতলবে ঘুরে। কিন্তু তাদের মতলবটা একেবারে টপ সিক্রেট, কেউ ধরতে পারে নি। এমন কি পাশের উপজেলার মোকাদ্দেছ চেয়ারম্যান ও না। সতর্ক থাকলে মোকাদ্দেছের এলাকা থেকে ৩৫টা লাশ আনা যেতো না। এখন অবশ্য মোকাদ্দেছ লোক পাঠালেও লাভ হবে না। লাশ বলে কথা,ততক্ষনে ফলে ফেঁপে ঢোল। মোকাদ্দেছের লোকেরা সনাক্ত করার কোন উপায় নেই। লাশের গার্জেনরা ভিড় জমাচ্ছে, ছেলামত মেম্বার সেদিক সামলাচ্ছে, সাথে দু’জন চৌকিদার। ইতিমধ্যে হাবিব উল্লা লাশের গার্জেনদের উদ্দ্যেশ্যে ছোট-খাটো একটা বক্তৃতা করেছে। গার্জেনদের কাছে লাশ রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেছে। তাদের ঘরের টিন থেকে শুরু করে গরু-ছাগল পর্যন্ত রিলিফ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে লাশগুলোর জন্য হাবিব উল্লার অস্বস্তির খারাপ লাগেেছ। কিন্তু তাদের কি? ”চরেতে জন্ম যার, নদীতে মরণ।” এ পুরোনো প্রবাদ জানা আছে তার। এখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। এমপি সাহেব হেলিকপ্টার নিয়ে আসবেন। সাথে মন্ত্রি-মিনিস্টার ও থাকবেন। সাংবাদিক ছবি তুলবেন। পুরো উপজেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষনা করা হবে। তেষট্রিটা লাশ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে। ঘোষনা না করে পারে না। তাকে এমপি সাহেব বলেছেন, এধরণের ঘটনাগুলো উন্নয়নের ইস্যূ। দেশের উন্নয়নের প্রশ্নও নাকি এর সাথে জড়িত। ঝড়ের ধ্বংশযজ্ঞের ছবিগুলো বিদেশিরা যখন দেখবে,তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। দেশটার জন্ম থেকেই এ ধরণের উন্নয়ন হয়ে আসছে। উন্নয়নের জন্য এমপি সাহেব তেইশ বছরে চার বার দল বদল করেছেন।

দূর থেকে হেলিকপ্টারটা দেখে মনে হয় -একটা শকুন আসছে। এক সময় সেটা দানবীয় আকার ধারণ করে। দূষিত বাতাসকে তোলপাড় করে কানফাটানো আওয়াজ ছড়িয়ে সেটা অগ্রসর হয়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক সার কলাগাছের সাথে তুমুল তর্ক-বিতর্ক করে হেলিকপ্টারটা স্থির হয়। মন্ত্রি-এমপিগণ ক্রমান্বয়ে নেমে আসেন। শেষে নামেন সাংবাদিকরা। সবাই হাবিব উল্লা চেয়ারম্যানের সাথে মোলাকাত করে নাকে রুমাল চেকে লাশের দিকে অগ্রসর হন। লাশগুলো ততক্ষনে দ্বিগুন ফলে উঠেছে। শোয়ানোর সময় তাদের পরম্পরের মাঝখানে যে ফাঁকটুকু রাখা হয়েছিলো সে ফাঁক লাশগুলো দখল করে নিয়েছে।
জনা কয়েক সাংবাদিক পালাক্রমে ছবি তুলতে শুরু করেছেন। সকলের দৃষ্টি সেই দিকে। ঠিক সেই সময় তড়িৎ গতিতে ছুটে আসে বছির। সে ভেউ করে কেঁদে উঠে এমপি সাহেবের হাত ধরে টান দেয়। টানতে টানতে বছিরের বাপ উজির আলীর কাছে নিয়ে যায়। এমপি সাহেব পরিস্থিতির চাপে কিংকর্তব্যবিমূড়। যন্ত্রচালিতের মত তিনি সাংবাদিকদের ফোকাস এরিয়ার মধ্যে উজির আলীর লাশের কাছে চলে যান। বছির এক টানে তুলে ফেলে উজির আলীর শরীরে জড়ানো চটের আবরণ। চটের তলা থেকে বেরিয়ে আসে ন্যাংটা উজির আলী তার ফুলে উঠা শরীর ও শিষ্মা নিয়ে। বছিরের এক হাতে এমপি হাত শক্ত করে ধরা, অন্য হাতে সে উজির আলীর লাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে হু হু শব্দ ছড়িয়ে প্রশ্ন করে,” এইটা কি মানুষ না গরু ? কন এমপি সাব জবাব দেন, এইটা কি গরু না মানুষ?”
এ ঘটনার তাৎক্ষনিক কোন প্রতিক্রিয়া হয়না। আর দশটা ঘটনার মত এটিও গোটা ঘটনা সা¤্রাজ্যে মিশে যায়। এমপি সাহেবও নিরাপদে ফিরে আসেন। সাংবাদিকদের ক্যামেরায় দু’ একটা ছবি তোলা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলো কোনো পক্রিকায় ছাপা হয় না। শুধু এমপি সাহেবের ছোট্র একটি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো। তিন দিন তিনি খাবার থেতে পারেন নি। খাবার মূখে দিলে তার মনে হয় তিনি উজির আলীর লাশ খাচ্ছেন। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে উজির আলীর ফুলে ওঠা মূলিবাঁশের মত শিষ্মা।

এই সংক্রান্ত আরো সংবাদ

আহা চিকুনগুনিয়া !

ঈদের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে পা দিয়ে আমিবিস্তারিত পড়ুন

‘দৃষ্টিশক্তি থাকা, কিন্তু জীবনে লক্ষ্য না থাকা অন্ধত্বের চেয়েও খারাপ’

চক্ষু, কর্ন, জিহবা, নাসিকা, ত্বক – মানুষের এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়েরবিস্তারিত পড়ুন

ধর্ষিতা মেয়েটির গল্প

পারিনি সেদিন নিজেকে শোষকদের হাত থেকে রক্ষা করতে, পারিনি সেদিনবিস্তারিত পড়ুন

  • যা হবে কবিতা লিখে…!
  • কাটাপ্পা বাহুবলির পর এইবার হিরো আলম ড্রেস?
  • দর্শক যেভাবে বুঝলেন যে মাশরাফির স্ত্রী ক্রিকেট খেলেন না!
  • ‘‘আজকাল আইসিসির সহযোগিতা ছাড়া মাশরাফি-তামিমদের বিপক্ষে জেতা যায় নাকি’’
  • যেসব খাতে ভ্যাট বসানো অতি জরুরি
  • ভাড়া ১০০ টাকা, ভ্যাট-ট্যাক্স মিলে ২৪০!
  • দুদকের হয়ে কেস লড়তে চান কেডি পাঠক
  • শততম টেস্টে আম্পায়ার কেন ওই রকম করলেন?
  • রিক্সা চালাই বিয়ে করেছিলাম, আমার মতই এক গরীবের মেয়েকে বউ করে এনেছিলাম —
  • নারীর দাস জীবন এবং একজন সাদিয়া নাসরিন
  • আজকের এ দিনে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো ঢাকার রাজপথ