নোংরা পরিবেশ, ফেল করা ডাক্তাররা যেখানে দেয় চিকিৎসা!
নোংরা পরিবেশ, মাত্র ৫০০ বেড আর শল্যচিকিৎসায় ফেল করা চিকিৎসকদের দিয়ে চলছে রোগীর চিকিৎসা। এই হলো বাংলাদেশের অন্যতম সরকারি মানসিক হাসপাতালের হাল!
ছোটবেলা থেকে শিখে আসা আপ্তবাক্য, ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। এই স্বাস্থ্য বলতে কিন্তু শারীরিক এবং মানসিক উভয়কেই বোঝায়। সঠিক মানবিক বিকাশের জন্য শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বের দাবিদার। কিন্তু উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে তুলে ধরলে আশাহত হতে হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীন, জাপান বা অন্যান্য আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি একরকম উপেক্ষিতই বলা চলে। এখানে নেই কোনো উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। যে কয়েকটি মানসিক হাসপাতাল রয়েছে তার সংখ্যাও খুবই অপ্রতুল। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা পদ্ধতি চলে এখনও সেই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তো দূরে থাক রোগীদের পর্যাপ্ত আসন সংখ্যাই নেই।
বাংলাদেশে এখনো শেকলে বেঁধে ঝাড়ফুঁক দিয়ে চলে মানসিক রোগের চিকিৎসা। কবিরাজের দেয়া তাবিজ-কবজে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের মানুষের এখনও পাকাপোক্ত বিশ্বাস। মানসিক চিকিৎসার জন্য যে কয়েকটি হাসপাতাল আছে সেগুলোর অবস্থাও করুণ।


পাবনার হেমায়েতপুরের ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’। বাংলাদেশের মানসিক রোগের চিকিৎসায় এটি একটি অন্যতম মানসিক হাসপাতাল। কিন্তু সম্প্রতি অ্যালিসন জয়সি নামে এক বিদেশি ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরায় উঠে এসেছে এই হাসপাতালের প্রকৃত চিত্র।
জয়সি বলেন, বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি মানসিক হাসপাতাল এটি। অথচ আসন সংখ্যা মাত্র ৫০০, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাংবাদিক জয়সি জানান, এখানে এমনও কিছু চিকিৎসক আছেন যারা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞও নন। এখানে এমনই একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় যিনি শল্যচিকিৎসক হিসেবে পাস না করতে পেরে এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। জয়সি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি বাজেটের মাত্র ০.৫% মানসিক স্বাস্থ্যে বরাদ্দ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় আর্থিক বাজেটও নেই।
মোস্তফা জামান নামের ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে মানসিক রোগকে রোগ হিসেবেই গ্রাহ্য করা হয় না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ লোক মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। যেখানে ২০ শতাংশ রোগীর বয়সই ১২-১৭ বছর যা খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
হেমায়েত পুরে রোগীদের থাকার বিছানাগুলো নোংরা আর জীবাণুযুক্ত। অনেক রোগীকেই মেঝেতে ঘুমাতে হয়। খাবারের মান খুবই নিম্ন আর অপর্যাপ্ত। রোগীরা নোংরা মেঝেতে বসেই খাবার গ্রহণ করে। তবুও এখানে প্রচুর রোগী আসে।


২৬ বছর বয়সী মনিরুল ইসলামকে এই হাসপাতালে তার পরিবার প্রায়ই নিয়ে আসেন পরীক্ষা করানোর জন্য। জানা যায়, মনিরুল দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা, ঘুমের বড়ি, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকে আসক্ত। সে প্রায়ই নেশাগ্রস্ত হয়ে তার পরিবারের সদস্যদের আক্রমণ করে। তাই তাকে এখানে এনে চিকিৎসা দেয়া হয়।
বাংলাদেশে এখনও সিংহভাগ মানসিক রোগীকেই বাড়িতে রেখে বিভিন্ন কু-চিকিৎসা দেয়া হয়। জিনভূত বা পরীর আছরের কথা বলে করে গ্রামগঞ্জের মানুষ ঝাড়ফুঁক, পড়া পানিসহ কবিরাজের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে। এসব রোগীকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেকলে বেঁধে রাখা হয় এবং চিকিৎসার নামে এদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এসব কু-চিকিৎসার ফলে প্রায়ই ঘটে প্রাণহানি।


২২ বছর বয়সী রফিকুলকে তার পরিবার মানসিক চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। কয়েকদিন পরই সেখানের চিকিৎসকরা তাকে সুস্থতার সনদ দিয়ে ছেড়ে দেন। এর পরও সে মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এখন তাকে সবসময়ই বেঁধে রাখেন তার পরিবার। সে কথা বলতেও পারে না।


তারা নামের আরেকজন ১৬ বছরের কিশোরীকে তার পরিবার পাবনা মানসিক হাসপাতেলে ভর্তি করান। কিছুদিন পর সুস্থ আখ্যা দিয়ে চিকিৎসকরা তাকেও ছেড়ে দেন। কিন্তু তারার পরিবার জানায়, এর পর থেকে তারার অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। সে প্রায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় এবং নিজের শরীরের ওপর অত্যাচার চালায়। তার পরিবার আরও জানায়, সে একবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল।
এই হলো বাংলাদেশের পাবনার সরকারি মানসিক হাসপাতালের আসল চিত্র যেখানে অসুস্থ রোগীরা সুস্থতার সনদ নিতে আসেন, অথচ তাদের সুস্থতার নজির খুবই কম। দেশের অন্যতম একটি প্রধান সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ আর চিকিৎসা পদ্ধতি যদি এমন হয় তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
এই সংক্রান্ত আরো সংবাদ


সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ: গোপালগঞ্জে যুবককে বিবস্ত্র করে মারধর
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জে এক সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যের ওপর হামলা, মারধরবিস্তারিত পড়ুন


ঝিনাইদহে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৬৫
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় বিএনপির দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষেবিস্তারিত পড়ুন


‘পেটের দায়ে এই জানমারা গরমেও রিকশা নিয়ে বাহির হতে হয়’
রাজশাহী মহানগরীর এক রিকশাচালক জীবিকার প্রয়োজনে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও রিকশাবিস্তারিত পড়ুন













